আনোয়ার সজীব, লেখক ও রাজনীতিবিদ
উপমহাদেশের মধ্যে যে কয়টি রাজনৈতিক দল রয়েছে তার মধ্যে আওয়ামী লীগ অন্যতম। এই দলটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ এবং পুরনো।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব হলেও মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি রয়ে যায় ঝামেলাপূর্ণ দুটি ভিন্ন জাতিসত্তার ভূখণ্ডে। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ছিলো উর্দু ভাষাভাষীদের এলিট মনোভাবাপন্ন ডমিনেটিং স্টাইলার দের রাজনৈতিক ভূখণ্ড, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান ছিলো সাদামাটা বাঙালিদের প্রাণের মাতৃভূমি। শুরু থেকেই উর্দু শাসক শ্রেণি বাঙালিদের নির্যাতন করতে থাকে। ফলে তাদের অপশাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য ১৯৪৯ সালের ২৩ শেষ জুন, পুরান ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনে, যে রাজনৈতিক সংগঠনটি গড়ে ওঠে তার নাম ছিলো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি, শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গড়ে তোলেন। কিন্তু ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়, তখন শেখ মুজিব ছিলেন কারাগারে।
প্রতিষ্ঠাকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন টাঙ্গাইলের মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ; টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে (খায়ের মিয়া) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। এসময় শেখ মুজিব কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন।
পরবর্তীতে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ১৯৫৫ সালে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেয়া হয়, তখন এর নতুন নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর সংগঠনটির নাম হয় 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।'
আওয়ামী লীগের রয়েছে সবচেয়ে পুরনো ও তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস। যে দলটির জন্ম ই হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পূর্বে, তাঁর তো বর্ণিল ইতিহাস থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রতীক হিসেবে মনোনয়ন করা হয় 'নৌকা'। তারপর থেকে এখন অবধি নৌকা ই রয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয়'দফা প্রণয়ন, ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান- এর প্রত্যেকটি ঘটনার সাথে লেখা রয়েছে আওয়ামী লীগের বর্ণিল ইতিহাসের কথা।
আওয়ামী লীগের যাত্রার শুরুতে অনেকেই সারথি হিসেবে পথ চলা শুরু করলেও পথিমধ্যে অনেকেই মতাদর্শের তারতম্যের কারণে দল ছেড়ে অন্য দলে চলে যায় অথবা নতুন দল গঠন করে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের হাল ধরে রেখে এটিকে একটি দুর্গে তথা একটি মজবুত সংগঠনে পরিনত করেন। তিনি একটি সাধারণ সংগঠন কে ঐতিহাসিক সংগঠনে পরিনত করেন।
তিনি ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, যে ভাষণে উদ্ভুদ্ধ হয়ে একটি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এক ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের যুদ্ধে। তিনি যখন বলেছিলেন 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম...' তখনই মুক্তিযুদ্ধের রণঘন্টা বেজে উঠেছিলো। পরবর্তী তে রাত ১২ টার পূর্বে অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ (কাল রাত) পশ্চিম পাকিস্তানি হায়েনার দল নিরীহ বাঙালিদের উপর আক্রমণ করলে, ঐ রাতের শেষ প্রহরে অর্থাৎ রাত ১২ টার পরে (তখন ২৬ শেষ মার্চ- প্রথম প্রহর) শেখ মুজিব কে গ্রেফতার করার পূর্বে তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান, এবং পরবর্তী তে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বেতারযোগে পাঠ করে শুনান। অতঃপর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাঙালিরা পায় তাদের কাঙ্খিত ভূখণ্ড 'স্বাধীন বাংলাদেশ।'
এই হলো বাংলাদেশ সৃষ্টির গল্প, যা আওয়ামী লীগের ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র।
প্রকাশক: মনসুর মো. এন হাসান
সম্পাদক: মো. আশরাফুল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী-সম্পাদক: আনোয়ার সজীব