ঢাকা, সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

তাঁর আগমনেই বিদ্রোহ এসেছিলো…

দৈনিক স্লোগান, মতামত

“বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি, আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”

-এই অমর কবিতার যিনি স্রষ্টা, তিনি সকল যুগের সব সংকটের উর্ধ্বে, সাম্যের জয়গান গেয়ে বিষের বাঁশি বাজিয়ে, দোলনচাঁপায় দোল দিয়ে দিয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন অগ্নিবীণার সুর। তিনি প্রেমের-দ্রোহের কবি, তিনি বিদ্রোহী, তার কলম যুদ্ধাস্ত্রের চেয়েও ধাঁরালো। তিনি সকল দেশের, সকল যুগের। তিনি প্রেমের, গীতের, দ্রোহের, সাম্যের, আধুনিকতার কবি- কাজী নজরুল ইসলাম।

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, বিদ্রোহী কবি নজরুলের ১২৪ তম জন্মবার্ষিকী। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এই তারিখে (২৫ মে, ১৮৯৯ ইং) তৎকালীন চুরুলিয়া গ্রামে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে পশ্চিম বর্ধমান জেলা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন সংকল্পের স্রষ্ঠা, নজরুল ইসলাম।
তিনি ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতীয় নাগরিক ; তারপর ১৯৪৭-১৯৭২ পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় নাগরিক এবং সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশী হিসাবে নাগরিকত্ব লাভ করেন (১৯৭৬ অ্যাপ্রুভ হয়) । ১৯৭৬ সাল অর্থাৎ মৃত্যু অবধি তিনি বাংলাদেশী নাগরিক ছিলেন। দুঃখ দিয়ে জীবন গড়া বলেই হয়তো তাঁর ডাকনাম ছিলো ‘দুখু মিয়া’।

পারিবারিক পরিচয়ঃ
পিতা- কাজী ফকির আহমেদ
মাতা- জাহেদা খাতুন
দম্পতি- আশালতা সেন গুপ্ত (প্রমীলা দেবী) ও নার্গিস আসার খানম।
সন্তানঃ কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরূদ্ধ।

স্কুল জীবন পার হওয়ার আগেই ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং শৈশবে ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েও তিনি বড় হয়েছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ সত্তা নিয়ে। একই সঙ্গে তার মধ্যে বিকশিত হয়েছিল একটি বিদ্রোহী সত্তা। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজন্যদ্রোহিতার অপরাধে কারাবন্দী করেছিল। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন অবিভক্ত ভারতের বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন।

যে নজরুল সুগঠিত দেহ, অপরিমেয় স্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসির জন্য বিখ্যাত ছিলেন, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারাত্মকভাবে স্নায়বিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে পড়লে আকস্মিকভাবে তার সকল সক্রিয়তার অবসান হয়। ফলে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু অবধি সুদীর্ঘ ৩৪ বছর তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে সপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকা স্থানান্তর করা হয় এবং এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

>>>  ছয়'দফা ই ছিলো বাঙালির মুক্তির সনদ

বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে তাকে “জাতীয় কবি“ হিসাবে মর্যাদা দেওয়া হয়। তার কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তা বাংলাভাষী পাঠকের মধ্যে তুঙ্গস্পর্শী। তার মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহ, ধর্মীয়গোঁড়ামির বিরুদ্ধতা বোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় একশত বছর যাবৎ বাঙালির মানসপীঠ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে।

ধূপছায়া ‘ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন তিনি। এটিতে তিনি একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ এবং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রের। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন তিনি।

তিনি ‘পিক্স ডিজিজ’ নামে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ৭৭ বছর বয়সকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।

লেখক: সাবেক সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

সর্বশেষ

এই বিভাগের সর্বশেষ

সর্বশেষ :