তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আবার ক্ষমতায় বসেছেন। নির্বাচনে জেতার পরপরই তাঁকে বিশ্বনেতাদের অনেকেই অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের বৈশ্বিক কৌশলগত তাৎপর্য কী, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
তবে এই বিশ্বনেতাদের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটু আলাদা। তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে উজ্জীবিত করতে এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে, ভোটের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই এরদোয়ানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তুরস্কের যে নীতি রাশিয়ার বিশেষভাবে পছন্দ, তা হচ্ছে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর ক্রেমলিনকে একঘরে করে দিতেই এরদোয়ানের অস্বীকৃতি। এমনকি ন্যাটোতে তুরস্কের মিত্ররা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরও এরদোয়ান সেই পথ ধরেননি। দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক এবং রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর পাঠানো বার্তাও বেশ উষ্ণ ছিল। ক্রেমলিনের প্রতি এরদোয়ানের সহানুভূতিশীল হওয়া ও ক্ষমতার দুই দশকে ঘরের ভেতরে বাক্স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মনোভাব টেনে ধরার বিষয়টি পশ্চিমা এই নেতাদের অপছন্দ হলেও দিন শেষে কিন্তু তুরস্ক তাঁদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।
এরদোয়ান হচ্ছেন এমন এক নেতা, যিনি একই সাথে রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, আবার ইউক্রেনেও সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকেন। তিনি দুই দেশের মধ্যেই সমঝোতা ঘটিয়ে গম সরবরাহব্যবস্থা সচল করে সুনাম কুড়িয়েছেন, যে গমের ওপর বিশ্বের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। একই সাথে দীর্ঘ সময়ের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ফিনল্যান্ডকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছেন।
একসময় তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যুক্ত করতে এরদোয়ান প্রবল উৎসাহী থাকলেও তাঁর বক্তব্য এখন, ‘মেকিং তুর্কি গ্রেট অ্যাগেইন’। এর জন্য তিনি তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বেশি স্বতন্ত্র করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তার মিত্রদের সাথে অত্যন্ত লেনদেনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
এখন নিজেদের নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন আশা করছে, তুরস্ক শরণার্থীদের সিরিয়ায় জোরপূর্বক ফেরত পাঠাবে। যদিও ভূমধ্যসাগর দিয়ে নৌকা করে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের ইউরোপে পাঠানোর জন্য মানব পাচারকারীদেরকে আর বাধা দেয় না তুরস্ক।
ইজিয়ান সাগরকে কেন্দ্র করে গ্রিসের সাথেও এরদোয়ান নানা বিরোধে জড়িয়ে আছেন। আর প্রায় ৫০ বছর আগে তুরস্কের আক্রমণের পর থেকে সাইপ্রাসে একটি বিভাজন তৈরি হয়ে আছে। সেখানে এরদোয়ান দুই রাষ্ট্রনীতির প্রস্তাব দিলেও সাইপ্রাস তা নিয়ে এখনো বিচলিত রয়েছে। ফলে এসব কারণেও ব্রাসেলস রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
পশ্চিমারা তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্বকে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সেতু হিসেবে বর্ণনা করত। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন তুরস্কের সেই মর্যাদা পাল্টে দিয়েছে। ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদে পদার্পণ করার মধ্য দিয়ে এরদোয়ানের কাছ থেকে পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের চমক আশা করছেন অনেকেই। তুরস্ক কী করে, সেটিই হচ্ছে এখন দেখার বিষয়।
বিবিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ
●কাটায়া অ্যাডলার বিবিসির ইউরোপ সম্পাদক






