ঢাকা, সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

টুইটার হবে এখন থেকে ‌এক্স

পাখি তাড়িয়ে ক্ষান্ত হলেন না তিনি, এবার পাখির কণ্ঠরোধও করতে চলেছেন! একটা প্রতিষ্ঠান বিশ্বে এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠল যে তার নামটি হয়ে উঠল ভাষার ক্রীড়াপদ, ঠাঁইও পেল অভিধানে। এটা দুর্লভ। এর চেয়েও দুর্লভতর ঘটনা হচ্ছে—এমন খ্যাতি পাওয়া ব্র্যান্ডটির নামই পাল্টে দেওয়ার দুঃসাহস করা।টুইটার কিনে সম্প্রতি ইলন মাস্ক তাই করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই খামখেয়ালিপনার মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল ব্র্যান্ডকে ধ্বংস হওয়ার দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন ইলান মাস্ক। মাস্কের বালখিল্যে টুইটারের তিলে তিলে গড়া ব্র্যান্ড ভ্যালুর ক্ষতি ডলারের অঙ্কে কত হতে পারে? বিশ্লেষকদের ধারণা, সংখ্যাটা হবে ৪০০ কোটি থেকে দুই হাজার কোটির মধ্যে।

অথচ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথোপকথনের সাথে দুটি ক্রিয়াপদ ‘টুইট’ এবং ‘রিটুইট’ ঘনিষ্ঠভাবে জুড়ে গিয়েছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সেলিব্রিটি, সাধারণ মানুষ এবং রাজনীতিবিদদের অভিধানে যুক্ত হয়েছে এই ক্রিয়াপদ দুটি।

করপোরেট ব্র্যান্ডগুলোর সামনে নিয়ে এসেছিল বিশাল সুযোগ। কিন্তু ইলন মাস্ক ঢেলে সাজানোর নামে টুইটারের লোগো এবং নামই পরিবর্তন করে ফেললেন। 

ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, তিনি নীল পাখির লোগো ও এর সাথে জড়িত সমস্ত শব্দ থেকেই মুক্তি চান। টুইটারের নাম এখন থেকে হবে ‘এক্স’।

ঘোষণা আসার পরই মাইক্রোব্লগিং ওয়েবসাইটটি থেকে উড়ে যায় নীল পাখি। তার পরিবর্তে ‘এক্স’ অক্ষরটি ভেসে উঠেছে। মাস্কের এই সিদ্ধান্তে অনেকেই একমত হতে পারছেন না। 

কয়েকজন বিশ্লেষক ও ব্র্যান্ড এজেন্সির মতে, মাস্কের এই পদক্ষেপের ফলে টুইটারের মূল্য চার বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে। ইলন মাস্ক গত বছরের অক্টোবরে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে টুইটার ক্রয় করে নেন।

কেনার পর ইতিমধ্যে টুইটারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। এত কিছুর মধ্যেই মাস্ক টু্‌ইটারের এই বিশাল পরিবর্তন আনলেন। 

শনিবার মধ্যরাতে এই পরিবর্তনের ঘোষণা দেন ইলন মাস্ক। সোমবার সকালের মধ্যেই নীল পাখির বদলে আসে নতুন কালো ‘এক্স’ লোগো। তখন থেকেই একজন ভক্তের করা ডিজাইনটি টুইটারের ওয়েবসাইটজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিন্ডা ইয়াকারিনো মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘এক্স’-এর জন্য সকল নতুন পরিকল্পনা করেছেন। অডিও থেকে শুরু করে ভিডিও, মেসেজিং, পেমেন্ট এবং ব্যাংকিং—সব থাকছে পরিকল্পনায়।

>>>  মেসেঞ্জারে নির্দিষ্ট প্রেরকের বার্তা একসঙ্গে মুছবেন যেভাবে

ইলন মাস্ক টুইটার কেনার পরই বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন। ফলে অনেক বিজ্ঞাপনদাতাই এই সাইট থেকে সরে পড়েন। এরপর গত বছরের অক্টোবর থেকে টুইটারে বিজ্ঞাপনের আয় ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক।

সিগেল অ্যান্ড গেলের ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের পরিচালক স্টিভ সুসি বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাপী এত বেশি ইক্যুইটি অর্জন করতে ১৫ বছরের বেশি সময় লেগে যায় টুইটারের। তাই টুইটার নামটি হারানোর অর্থ একটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি।’

ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোশুয়া হোয়াইট বলেছেন, ‘টুইটারের জনপ্রিয়তা ব্যাপক! টুইট ও রিটুইট ছিল সেলিব্রিটি থেকে রাজনীতিবিদ—অনেকেরই দৈনন্দিন জীবনের অংশ।’

প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন অবশ্য অনেকেই করে। কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের নাম পরিবর্তন করেছে। যেমন গুগল নাম পরিবর্তন করে রেখেছে অ্যালফাবেট ইনকরপোরেটেড। আবার ফেসবুক নাম পরিবর্তন করে রেখেছে মেটা প্লাটফরমস ইনকরপোরেশন। তাদের উদ্দেশ্য শুধু অনুসন্ধানের সাথে আবদ্ধ না থেকে কম্পানির মধ্যে অন্যান্য ব্যবসার বিকাশ ঘটানো। তবে নাম পরিবর্তন করলেও ইন্টারনেটে সার্চ করলেও এসব অ্যাপ পাওয়া যায়।

ব্র্যান্ড ভ্যালুয়েশন কনসাল্টিং ফার্ম ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স অনুসারে, টুইটারের ব্র্যান্ড ভ্যালু বর্তমানে চার বিলিয়ন ডলার হতে পারে। যেখানে ফেসবুকের ব্র্যান্ড ভ্যালু ৫৯ ও ইনস্টাগ্রামের ৪৭.৪ বিলিয়ন ডলার। তবে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় টুইটারের ব্র্যান্ড ভ্যালু অনুমান করেছে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে ব্র্যান্ড ভ্যালু নির্ণয় করা বেশ কঠিন। কোনো একক পদ্ধতি না থাকার ফলে অনুমানে একটু গরমিল হতে পারে বলে জানান ফরেস্টার রিসার্চ ইনকরপোরেটেডের বিশ্লেষক দীপাঞ্জন চ্যাটার্জি। কিন্তু মূল্য যা-ই হোক, কয়েকজন বিশ্লেষক ও এজেন্সি একমত, মাস্ক টুইটার কেনার পর থেকে কম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালুতে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স সংস্থা বলেছে, গত বছর থেকেই টুইটার তার ব্র্যান্ড ভ্যালুর ৩২ শতাংশ হারিয়েছে।

ইনসাইডার ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক জেসমিন এনবার্গ বলেন, ‘টুইটারের করপোরেট ব্র্যান্ড নামটি ইতিমধ্যে মাস্ক প্রদত্ত ব্র্যান্ড নাম এক্স ছাড়াই ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডটি ইতিমধ্যে ব্যবহারকারী এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেছে।’

>>>  ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী

মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ড কনসাল্টিং গ্রুপ মেটাফোর্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন অ্যাডামসন বলেছেন, ‘ব্যবসা এবং ব্র্যান্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’ তিনি এটিকে ‘অহংকারী সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমার মতে একটি ব্যবসা এবং ব্র্যান্ড, খুব দ্রুত সব হারিয়ে ইতিহাসে পরিণত হতে যাচ্ছে।’

এই ছাড়া মাস্কের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যেরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অ্যাপে ব্যাংকিং এবং অর্থ প্রদানের জন্য গ্রাহকের আস্থার প্রয়োজন হবে। তাই একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে সেটা পাওয়া কঠিন। মাস্কের মূল ফ্যানবেইসের বাইরের গ্রাহকরা অর্থের বিনিময়ে টুইটার ব্যবহার করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে একটাই বিষয় মাস্কের জন্য শুভ, সেটা হলো ‘ইলন ব্র্যান্ড’। ইলন মাস্ক নিজেই যখন একটি ব্র্যান্ড, তখন প্রতিষ্ঠানের নাম টুইটার নাকি এক্স—তাতে আর কী বা আসে-যায়!

সূত্র : টাইম


সংবাদটি শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

সর্বশেষ

এই বিভাগের সর্বশেষ

সর্বশেষ :